সতর্কতাসাধারন জ্ঞানস্বাস্থ্য টিপস

শিরায় স্যালাইন দিলেই কি রোগী সুস্থ হয়ে যাবে!

দীর্ঘ মেয়াদী রোগে ভোগা মানুষদের মধ্যে বড় দূর্ভাগ্যবান কিছু থাকেন, যাদের সুযোগ-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সু-চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়ে অকালে মারা যান। জীবনে এমন অজস্র ঘটনা দেখেছি। যারা শিরায় স্যাইলাইন দিতে খুব পছন্দ করেন। এটা ভাবেন! স্যালাইন Saline গাঁথলেই হয়ত সুস্থ্য হয়ে যাবেন।

অকারনে স্যালাইন দেয়া :

ধরা যাক বাড়িতে কেউ অনেকদিন ধরে কোন অসুখে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন। ছেলে, সন্তান, ভাই, বোন আত্মীয় সকলেই আছেন। চিকিৎসাটা যেখানে, যেভাবে করানো উচিত, তা না করে, করেন উল্টোটা। ধরা যাক কারও বাবা বা মা অসুস্থ৷! পল্লী চিকিৎসক দিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা শুরু, কোনদিন হাসপাতাল বা নার্সিং হোম বা ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসার কথা ভাবতেই নারাজ, কেননা তাতে খরচ তো কিছু হবেই ! বুড়া হয়ে গেছে অথবা জোয়ান হলেও রোগে ভোগতে ভোগতে চিরযাত্রার দিন অপেক্ষা করছেন, তার পেছনে খরচ করে লাভ কি! এমন ধারনা অনেকের মনে দানা বেঁধে যায়।

পল্লী চিকিৎসা :

কিন্তু সময় মতো উন্নত চিকিৎসায় অনেক খারাপ রোগও সেরে যায়, সেটা সকলে জানলেও অনেকে সুযোগটা কাজে লাগাতে চান না। রোগীকে কোনদিন হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে, কোন ডায়গনস্টিক পরীক্ষা নিরীক্ষা না করিয়ে কতদিন পরপর বাড়িতে কোন ডাক্তার ডেকে ডেকে দায়ছাড়া এক রকম চিকিৎসা চালিয়ে যান।

বিষয়টা আমার কাছে অনেকটা লোক দেখানোর বিষয় বলেই মনে হয়। ধরুন কারও চার ছেলে বাবা মায়ের সাথে বাড়িতে আছেন, অন্য এক ভাই দূরে কোথাও চাকরী-বাকরী নিয়ে পড়ে আছেন। কোনদিন বাড়ি এসে বাবার খারাপ অবস্থা দেখে একশ, দু’শ তিনশ বা পাঁচশত টাকা ভিজিট দিয়ে কোন ডাক্তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অসুস্থ রোগীকে দেখালেন।

মানবিক ডাক্তার :

মানবিক ডাক্তার হলে বলেই দিবেন – রোগীকে তাড়াতাড়ি বড় শহরের অমুক হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান এবং সেখানকার ডাক্তার রোগীর অবস্থা বুঝে দরকারী পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনীয় এবং সঠিক চিকিৎসাটা দিতে পারবেন। এভাবে কয়েকদিন রেখে রোগীর আরোগ্যের অবস্থা হলে বাড়ি ফিরে আসবেন।

ছেলেদের মাথায় পড়লো বারি- এত টাকা, এত শ্রম! কে দেবে, পোষাবে কি করে। তাই পথ ধরলো পল্লী চিকিৎসকের ! স্যালাইন গাঁথা ছাড়া বোঝে না বেচারা কি আর করবে ! সকালে একটা বিকালে একটা গ্লুকোজ স্যালাইন দিয়ে দিয়ে কয়েকদিন কোন রকমে রোগীর প্রাণটা বাঁচিয়ে রাখলো !

স্যালাইন গাঁথা :

তারপর কি? রোগীর নির্ঘাত মৃত্যু ছাড়া আর কি? এই স্যালাইন গাঁথানোটাকেই এত বড় একটা চিকিৎসা মনে করে ওরা, কি আর বলবো! অসুস্থ রোগীর বেলায় ঔষধের চেয়েও রোগীর নিউট্রিশনাল অবস্থা মেইনটেইন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে অঙ্ক কষে কষে ক্যালোরি ও ফ্লুইড ও ইলেকট্রোলাইট এবং তার আউটপুট ইনপুট হিসাব করে রোগীকে মুখে, শিরাপথে এমনকি নাক দিয়ে পাকস্থলিতে নল ঢুকিয়ে প্রয়োজনমাফিক খাদ্য ও ঔষধ দেয়া হয়।

সেখানে পল্লী চিকিৎসক ৫% বা ১০% ডেক্সট্রোজ স্যালাইন Saline হাতের শিরায় কয়েকটা না হয় দিতে পারলো। কিন্তু জরুরী অন্য ইলেকট্রোলাইটস, প্রোটিন, ফ্যাট বা মিনারেলস-এর হিসাবটা সে করবে কিভাবে ! ওটা তো হাসপাতাল ছাড়া সম্ভবই নয়।

আর পল্লী চিকিৎসকের যে স্যালাইনের কথা বললাম তাতে গ্লুকোজ, পানি ও লবণ ছাড়া আর কিছুই তো নাই। সে আর করবে কি? বাজারে প্রোটিন, ফ্যাট ও অন্যান্য ইলেকট্রোলাইট স্যালাইন বা অন্য আকারে পাওয়া গেলেও হাসপাতাল ছাড়া ঐগুলো পুশ করাই উচিত না।

গ্রাম ডাক্তারের উচিত :

হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হলেও তা এড়িয়ে লবণ ও গ্লুকোজ স্যালাইন দিয়ে রোগীকে দু’ চারদিন বেশি বাঁচিয়ে রাখারই দরকার কি? নাকে নল ঢুকিয়ে খাদ্য ঔষধ দেয়াটাকে রোগীর অনেক আত্মীয় তো পাপ কাজই মনে করেন, তাই এতে সাই দেন না। তাই পরিণতি যা হবার, তাই হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসা করালে ভাল হবার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তার গুরুত্ব না দিয়ে, খালি খালি লবণ-গ্লুকোজ স্যালাইন গাঁথিয়ে, রোগীর সুচিকিৎসা চলতেছে বলে, লোক দেখানো চিকিৎসা আর আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছুই আমি মনে করি না ! আমি অনেক দেখেছি, গ্রামে অনেক রোগী তার রোগের জন্য নয় বরং অসুখের সময় নিউট্রিশনহীনতা আর অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত স্যালাইন পুশ করার কারনেই রোগী তাড়াতাড়ি মারা যায়। কাজেই ঐ বাজে ট্র্যাডিশনগুলো পরিহার করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button